মেরাইথং জাদি – নীল সবুজের সমারোহের অদ্ভুত সৌন্দর্য্যের আরেক নাম । বান্দরবান জেলার আলিকদম উপজেলায় মেরাইথং জাদি পাহাড়টি সমতল থেকে প্রায় ১৭০০ ফুট উচু। এই পাহাড়ের চুড়াতে রাতের বেলা ক্যাম্পেইন করা যায়। এবং ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মেঘের মাথায় হাত রাখা যায়।

এই ট্যুরে তেমন কঠিন ট্রেকিং নাই। খুব সহজ পথ, শুধু একটু হাটার অভিজ্ঞতা থাকলেই যে কেও যেতে পারবে।

আলীকদম উপজেলাঃ

আলীকদম উপজেলার আয়তন ৮৮৫.৭৮ বর্গ কিলোমিটার। এটি বান্দরবান জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। ধারণা মতে, আলোহক্যডং থেকে আলীকদম নামের উৎপত্তি। বোমাং সার্কেল চীফের নথি পত্র ও ১৯৬৩ সালের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আঁকা মানচিত্রে আলোহক্যডং নামের সত্যতা পাওয়া যায়। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক আতিকুর রহমান এর মতে আলী পাহাড়ের সাথে সঙ্গতিশীল নাম হল আলীকদম। তাছাড়া কথিত আছে যে, ৩৬০ আউলিয়া এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলী নামে কোন এক সাধক এ অঞ্চলে আসেন। ওনার পদধুলিতে ধন্য হয়ে এ এলাকার নাম করণ হয় আলীকদম। আলীকদম উপজেলা পার্বত্যাঞ্চলের ইতিহাসের উপজীব্য। এখানকার বিলুপ্তপ্রায় আলীর সুড়ঙ্গ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন পুকুর। তাছাড়া এখানকার নয়াপাড়া গ্রামে প্রাচীন ইটভাটার অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান, যা বর্তমানে নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন বসতভিটা। ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গ্রন্থপ্রণেতা গবেষক আতিকুর রহমান সহ স্থানীয় সাংবাদিকরা ঐ এলাকায় মাটি খুঁড়ে ইট আবিস্কার করেছেন। আবিস্কৃত ইটগুলোর গঠনপ্রণালীতে সুলতানী আমলের ইট বলে অনুমিত হয়। উদ্ধারকৃত ইটগুলোর দৈর্ঘ্য সাত ইঞ্চি, প্রস্থ সাড়ে চার ইঞ্চি আর পুরু দেড় ইঞ্চি মাত্র। আবিস্কৃত ইটগুলো বর্তমানে আলীকদম প্রেসক্লাবে রক্ষিত আছে। [সূত্রঃ উইকিপিডিয়া]

কি করবেন, কি দেখবেন:

  • রাতের বাসে ঢাকা থেকে আলীকদমের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে।
  • পরের দিন সকালে আলীকদমে নাস্তা সেরে বিখ্যাত আলিকদম গুহায় যেতে পারেন।
  • এরপর আলীকদমের গুহা / সুড়ংগ দেখে অটো নিয়ে পানবাজার চলে যান। পানবাজার দুপুরের খাবার খেয়ে নিন।
  • খাবার-দাবার পানি এখান থেকে সংগ্রহ করে মেরাইথং জাদির উদ্দেশ্যে ট্র‍্যাকিং করতে হবে। ২ ঘন্টা হেটে চলে যান সেই কাংক্ষিত চূড়ায়ে – নীল সবুজের বুকে মেঘের খেলা।
  • ক্যাম্পিং করুন, তাবুতে ঘুমান, বার-বি-কিউ পারটি করুন, আড্ডাবাজিত রয়েছেই।
  • প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিন। সারাদিনের পরিশ্রম নিমিষেই মিলিয়ে যাবে।
  • পরের দিন পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে ঢাকার উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিতে পারেন।

ভ্রমনের খরচ:

৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা জন প্রতি, ৮-১০ জনের গ্রুপ হলে ভালো হবে। খরচ কমে আসবে।

মেরাইথং জাদি ক্যাম্পিং এর জন্য যা যা নিতে হবেঃ

  • ন্যাশনাল আইডি কাড ফোটো কপি
  • টেন্ট / তাবু – ২-৪ জনের সাইজের হলে ভালো হয়, ছোট হলে বহন করতে সুবিধা হবে
  • ব্যাকপ্যাক (প্রফেশনাল গ্রেড হলে ভালো হয়)
  • ট্রেকিং সু বা ট্রেকিং স্যান্ডেল
  • শীতের জন্য গরম কাপড়
  • তাবুতে বিছানোর জন্য বিছানার চাদর
  • স্লিপিং ব্যাগ ( থাকলে ভালো হয়)
  • চার্জার লাইট/ টর্চ লাইট
  • খাবার প্লেট / বাটি
  • সানগ্লাস , কানটুপি, ক্যা্প, গামছা
  • পানির বোতল, স্যালাইন
  • ম্যালেরিয়া ওষুধ
  • ব্রাশ ,প্রয়োজনীয় ঔষধ, ফার্স্ট এইড কিট
  • শুকনো খাবার
  • সুইস নাইফ – বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে লাগতে পারে
  • টিশার্ট – থারমাল / স্পোর্টস হলে ভালো হয়
  • প্যান্ট / ট্রাউজার / থ্রি-কোয়ারটার প্যান্ট – থারমাল / স্পোর্টস হলে ভালো হয় ,
  • ওডোমস – মশা নিবারন ক্রিম, সান ক্রিম (যদি অতিরিক্ত ত্বক সচেতন হন)
  • রবি সিম
  • মোবাইলের রেইন কভার (বৃষ্টি হলেও ভিডিও ও ছবি তোলার জন্য)
  • ক্যমেরা এবং এর এক্সট্রা ব্যাটারি
  • চার্জের জন্য পাওয়ার ব্যাংক

প্রতিটি যায়গা ই আমাদের নিজেদের, তাই তার সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। যেন টুরিজমের কোন ক্ষতি না হয়, সেটা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। যত্রতত্র পলিথিন ব্যাগ, বোতল ময়লা, আবর্জনা ফেলে প্রকৃতি ও পরিবেশ দুষিত করবেন না। প্রকৃতি দেখতে যেয়ে ধূমপান করবেন না। সিগারেটের আগুনে বনে আগুন লেগে যেতে পারে। ধূমপানে মানবিক, আর্থিক, পারিবারিক ও শা্রিরিক বিপর্যয় ঘটে।

স্থানীয়দের সাথে কোন রকম বিরূপ আচরণ করা যাবে না।

পাহাডে চড়ার কিছু সতর্কতামূলক টিপসঃ

  • বৃষ্টির সময় পাহাড়ে না চড়াই ভালো।
  • অবশ্যই ভালো গ্রিপ (রাবারের গ্রিপ) এর জুতা / স্যান্ডেল পরে যাবেন।
  • অনেকে উপরে উঠার সময় আশেপাশেরর লতাপাতা ধরে উঠার চেষ্টা করেন, এই কাজটা ভুলেও করবেন না। কারন আপনি জানেনা ওইগুলা আপনার ভার বহন করার মত যথেষ্ট শক্ত কিনা।
  • ব্যাগ যথাসম্ভব হাল্কা রাখুন। প্রতি পদক্ষেপে আপনার ব্যাগ ভারী হতে থাকবে।
  • পর্যাপ্ত পানি, জুস, স্যালাইন আর শুকনা খাবার রাখবেন। শুকনো খাবারের উপর একটি পোস্ট আছে আপনি দেখে নিতে পারেন।
  • জোঁক ছাড়ানোর জন্য সাথে লবন বা গুল রাখবেন। জোঁক কামড়ালে হাত দিয়ে টেনে ছাড়াতে যাবেন না, লবণ/গুল ছিটিয়ে দিলেই কাজ হবে।
  • ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা বেশ দুর্গম এবং পাথরের যায়গা পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই সতর্ক হয়ে পথ চলবেন। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা অনেক কঠিন হবে। একেবারে ওপরের ধাপগুলো খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে তাই সেই ক্ষেত্রে খুব সতর্ক হয়ে চলতে হবে। পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলে ওপরে ওঠার চেষ্টা না করাই ভালো।
  • বাঁশ সংগ্রহ করে বা কিনে নিবেন, পাহাড়ে বাঁশ আপনার প্রিয় বন্ধু।